কালিকাপুর – এর সাতমহলা রাজবাড়ির অজানা ইতিহাস

কালিকাপুর – এর সাতমহলা রাজবাড়ির অজানা ইতিহাস

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বঙ্গভূমি ফেসবুক পেজটি লাইক করুন

কালিকাপুর

মৃণাল সেন পরিচালিত ‘খন্ডহর ’ সিনেমার সেই দৃশ্য৷ শহর থেকে বেড়াতে যাওয়া তিন বন্ধু নাসিরউদ্দিন শাহ, পঙ্কজ কাপুর ও অনু কপূর ভগ্ন জমিদার বাড়ির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে , বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ হয় কী করে৷ গত দু’পুরুষ চাকরিতেই ভরসা রেখেছে৷ আর চাকরির টাকায় যে ওই হাতি পোষা যায় না তাও জানিয়ে দেয় সিনেমার চরিত্ররা৷

বাস্তবে সেই সিনেমাই কিন্ত্ত টিকিয়ে রেখেছে পূর্ব বর্ধমানের কালিকাপুর রাজবাড়ি৷ শুধু টিকিয়ে রেখেছে বললে ভুল বলা হবে , সিনেমার শুটিং থেকে রোজগারের অংশ দিয়ে দুর্গাপুজোও হয়৷

1

আউশগ্রাম -২ ব্লকের শাল – সেগুন – মহুয়ার ঘন জঙ্গলে ঘেরা কালিকাপুর গ্রাম। সাত রাজার বাড়ি এখানেই৷

সে প্রায় 400 বছর আগের কথা। বর্ধমান রাজার দেওয়ান ছিলেন পরমানন্দ রায়। সেই সূত্রে ইজারায় হাতে এল বিরাট জঙ্গল। সেই জঙ্গল কেটে তৈরি হল বসত। পেলেন আউসগ্রামের বড়ো অংশের জমিদারি। তৈরি হল পুকুর, বাগান, মন্দির। আর হল দুর্গামণ্ডপ। তারপর সাত পুত্রের জন্য সাতমহলা প্রাসাদ তৈরি করলেন। আদতে তাঁরা ছিলেন পাশের গ্রাম মৌখিরার বাসিন্দা। সেখানে জায়গার সঙ্কুলান না হওয়ায়, সেই সাথে অজয় নদ নিকটবর্তী হওয়ায় গ্রামে বন্যার প্রকোপ বাড়ছিল। তাই কালিকাপুরে চলে আসেন।

2

সাতমহলা বাড়ি আলাদা হলেও একটিই মণ্ডপ ছিল পুজোর জন্য। সাতমহলা বাড়ির পাশাপাশি রয়েছে বিশাল দরদালান, মধ্যে ফাঁকা আটচালা আর তিন দিক ঘেরা মন্ডপ। প্রায় ৩৮০ বছর আগে এখানেই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন পরমানন্দ রায়। রাজত্ব না থাকলেও রাজার বাড়ির পুজোর সমস্ত আদব কায়দা এখনও বজায় রেখে চলেন বর্তমান প্রজন্ম৷ কর্মসূত্রে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই বছরভর বাইরে থাকেন। তবে পুজোর সময় তাঁরা ঠিক কালিকাপুরে হাজির হন তাঁদের পরিবারের দূর্গোৎসবে অংশ নিতে। তবে চারদিন নয়। রায়বাড়ির পুজোয় পুরানো রীতি মেনেই এখনও দেবীর বোধন হয় পুজোর ১৫ দিন আগেই, পাশাপাশি শুরু হয় চন্ডীপাঠ ও আরতি। পুজো চলে দশমী অবধি। সেই সময় বর্ধমান রাজবাড়ি থেকে কালিকাপুর রায় বাড়িতে তত্ত্ব আসত৷ পুরোনো রীতি মেনে এখনও পালকিতে চাপিয়ে কলাবউকে স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে ১৫ দিন ধরে ছাগবলি হতো। এখন সপ্তমী থেকে নবমী মাত্র তিনদিনই হয় ছাগবলি। নবমীর দিন অসংখ্য মানুষ প্রসাদ নিতে আসেন।

বাড়ির এই পুজোতে একসময় নাটমন্দির আলোকিত হত বিশাল বিশাল ঝাড়বাতিতে। পুজোর ক’দিন নিয়ম করে বসত কবিগানের আসর, দুর্গাপুজোয় যাত্রাপালা মাস্ট ছিল কালিকাপুর রাজবাড়িতে। পালা দেখতে ভেঙে পড়ত গ্রাম। বাড়ির মেয়েরা যাত্রা দেখতেন দোতলার আড়াল থেকে। সেসব এখন অতীত। তবে আজও পুজোর সময় ভিড় বাড়ে রাজবাড়ির আনাচ-কানাচে। পরবাস ছেড়ে ঘরে ফেরেন পরমানন্দের উত্তরসুরীরা। যাত্রাপালা না হলেও আসর মাতে অন্তাক্ষরীর সুরে, নাটকের নেশায়। পুজো শেষ হতেই যে যার গন্তব্যে চলে যান।

3

রাজবাড়ি কিছুটা নিস্তেজ হয়ে গেলে ভিড় করেন সিনেমাওয়ালারা৷ বছরভর এখানেই চলে সিনেমার শ্যুটিং৷ সিনেমার শুটিংই কালিকাপুর রাজবাড়ি ও দুর্গাপুজো বাঁচিয়ে রেখেছে৷ প্রচুর সিনেমা ও বাংলা সিরিয়ালের শুটিং হয়েছে এখানে৷

মৃণাল সেনের ‘খন্ডহর ’, অর্পনা সেনের ‘গয়নার বাক্স ’, ‘গোঁসাই বাগানের ভূত ’, ‘হনুমান ডট কম ’, ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘নৌকাডুবি ’ হরনাথ চক্রবর্তীর ‘ভূতচক্র ডট কম’, অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘Teen’, পাওলি দাম অভিনীত ‘এলার চার অধ্যায়’সহ এমন বহু সিনেমার শুটিং এই বাড়িতে হয়েছে। এমনকি ইতালির পরিচালক ইলাম্বো লাম্বোর্তিনি এখানে একটি তথ্যচিত্রের শ্যুটিংও করেন৷ সম্প্রতি রাইমা সেন ও ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত সিনেমার শুটিংও হয়েছে৷
সেই কবে জমিদারি ও রাজত্ব শেষ হয়ে গিয়েছে৷ বিশেষ কোনও সম্পত্তি নেই৷ কেউ চাকরি করে, কেউ গ্রামেই চাষ করে৷ এত বড়ো বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ প্রচণ্ড ব্যয় সাপেক্ষ৷ বাড়ির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে৷ অনেক জায়গায় দেওয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ে গেছে৷ ছাদ ভেঙে পড়েছে৷ তাই নিষ্ঠা অটুট থাকলেও আর্থিক অনটনের কারণে রায় পরিবারের এই দুর্গাপুজোয় সেই পুরাতনি জৌলুস আর জাঁকজমকের টান পড়েছে। রায় পরিবারের এক সদস্যের কথায় জানা গেল, সিনেমাওয়ালারাই এখন তাঁদের বড় ভরসা৷ শুটিং করার জন্য বাড়ি বাবদ যে টাকা পাওয়া যায় তা দিয়ে এত বড় বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ -সহ পুজোর কাজে খরচ করা হয়৷ যারা রায় পরিবারের সদস্য তাঁরাও পুজোর জন্য সাধ্যমত খরচ করে৷

নেই সেই রাজত্ব। সাত রাজারবাড়ির অবস্থা এখন ভগ্নপ্রায়।

পথ নির্দেশ :– পানাগড় –মোড়গ্রাম সড়কে ইলামবাজার যাওয়ার পথে ১১ মাইল বাসস্টপ থেকে ডানদিকে যে রাস্তাটা গুসকরার দিকে চলে গিয়েছে সেই রাস্তা দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলে বাঁ দিকে একটি মাটির রাস্তা৷ ওই রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই কালিকাপুর গ্রাম৷

লেখক- সৌরভ কেশ (ফেসবুক প্রোফাইল)

ছবি- সৌরভ কেশ


বঙ্গভূমি ফেসবুক পেজটি লাইক করুন

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply